তৃণমূলের কলকাতা উত্তর দক্ষিনে বিদ্রোহ – অভিযুক্ত মমতা অভিষেকই

নিজস্ব সংবাদদাতা :: সংবাদ প্রবাহ :: কলকাতা :: রবিবার ১০,মে :: রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেই এবার প্রকাশ্যে ভাঙনের সুর। কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণ জেলার একাংশের নেতা-কর্মীরা দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব হয়ে কার্যত বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন।

রবিবার শহরের একাধিক এলাকায় বৈঠক ও বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে ক্ষুব্ধ নেতারা অভিযোগ তোলেন, “দলে আর গণতন্ত্র নেই, সব সিদ্ধান্ত হচ্ছে একতরফাভাবে।” দলীয় সূত্রে খবর, দীর্ঘদিন ধরেই কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণ সাংগঠনিক জেলায় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তীব্র হচ্ছিল।

টিকিট বণ্টন, পদ বণ্টন, পুরসভা ও বিভিন্ন বোর্ডে নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ জমছিল স্থানীয় স্তরে। সেই ক্ষোভই এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। রবিবার উত্তর কলকাতার মানিকতলা ও শ্যামবাজার এলাকায় কয়েকজন প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা বৈঠক করেন।

বিদ্রোহের আঁচ সবথেকে বেশি দেখা গিয়েছে উত্তর কলকাতার তৃণমূলের অফিশিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘অঘোষিত সম্রাট’ বলে আক্রমণ করে পদ ছাড়ার দাবি জানান।

এর পাল্টা দিতে গিয়ে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি লেখেন, “হাতি চলে বাজার, কুত্তা ভোঁকে হাজার।”

দলেরই কাউন্সিলরকে ‘কুত্তা’ সম্বোধন করায় পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। সুব্রত পাল্টা তোপ দেগে লেখেন, “দলের কাউন্সিলরকে যে কুত্তা বলে সে ভুলে যাচ্ছে সে কুত্তার চেয়ারম্যান।” এই কদর্য কাদা ছোড়াছুড়িতে বিড়ম্বনায় পড়েছে কালীঘাট।

সেখানে উপস্থিত নেতাদের একাংশ সরাসরি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। অভিযোগ ওঠে, “পুরনো কর্মীদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, বাইরে থেকে আসা নেতাদের দাপট বাড়ছে।”

এক বিদ্রোহী নেতা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন,“আমরা বহু বছর ধরে রাস্তায় লড়াই করেছি। এখন দলটা কর্পোরেট মডেলে চলছে। সাধারণ কর্মীদের মতামতের কোনও মূল্য নেই।”

দক্ষিণ কলকাতাতেও একই ছবি দেখা যায়। টালিগঞ্জ, কসবা ও বেহালা অঞ্চলের কয়েকজন তৃণমূল কাউন্সিলর ও প্রাক্তন পদাধিকারী আলাদা বৈঠক করে সংগঠনের বর্তমান কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের অভিযোগ, জেলার সিদ্ধান্তে স্থানীয় নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হচ্ছে।

ঘটনার জেরে তৃণমূলের অন্দরে ব্যাপক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি বৈঠকের ডাক দিতে পারে বলে সূত্রের খবর। ইতিমধ্যেই কয়েকজন ক্ষুব্ধ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন দলের শীর্ষ পর্যায়ের পর্যবেক্ষকরা।

তবে প্রকাশ্যে এই বিদ্রোহকে গুরুত্ব দিতে নারাজ তৃণমূল নেতৃত্ব। দলের এক মুখপাত্র বলেন, “তৃণমূল কংগ্রেস অত্যন্ত বড় দল। কোথাও কোনও ব্যক্তিগত অসন্তোষ থাকতেই পারে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দল ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।”

অন্যদিকে বিরোধীরা এই ঘটনাকে হাতিয়ার করতে শুরু করেছে। বিজেপির এক রাজ্য নেতা দাবি করেছেন, “তৃণমূলের ভিত নড়তে শুরু করেছে। দুর্নীতি ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দল ভেঙে পড়ছে।” বাম নেতৃত্বও কটাক্ষ করে বলেছে, “স্বৈরাচারী নেতৃত্বের ফলেই আজ এই পরিস্থিতি।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ধাক্কার পর থেকেই তৃণমূলের সংগঠনের ভিতরে চাপা ক্ষোভ বাড়ছিল। বিশেষ করে কলকাতা সংগঠনে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চরমে উঠেছে। আগামী দিনে এই বিদ্রোহ আরও বড় আকার নেয় কিনা, এখন সেদিকেই নজর রাজ্য রাজনীতির।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 + fourteen =