সুদেষ্ণা মন্ডল :: সংবাদ প্রবাহ :: ফলতা :: শুক্রবার ২৯,মে :: ফলতার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ)-এর সামনে শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়াল এলাকায়।
দীর্ঘদিনের ‘কাটমানি’, অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়েও প্রাপ্য মজুরি না দেওয়া, শ্রমিকদের ভয় দেখানো এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামলেন একাধিক শ্রমিক।
অভিযোগের তির ঘুরেছে কলাতলা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার তৃণমূল ঘনিষ্ঠ শ্রমিক ঠিকাদার সুরজিৎ প্রামাণিকের বিরুদ্ধে। শ্রমিকদের দাবি, জাহাঙ্গীর খানের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় শ্রমিকদের উপর শোষণ চলেছে। বর্তমানে তাঁরা ন্যায্য অধিকার এবং প্রাপ্য অর্থ ফেরতের দাবিতে আন্দোলনে সামিল হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ফলতার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্তর্গত নিপা কোম্পানিতে বহু বছর ধরে শ্রমিকদের কাছ থেকে ‘কাটমানি’ নেওয়া হতো বলে অভিযোগ। আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি, গরিব শ্রমজীবী মানুষদের মজুরি থেকে নিয়মিত টাকা কেটে নেওয়া হতো।
সেই কাটমানির সঙ্গে জড়িত ছিলেন সুরজিৎ প্রামাণিক নামে এক তৃণমূল নেতা, যিনি স্থানীয়ভাবে শ্রমিক ঠিকাদার হিসেবেও পরিচিত। শ্রমিকদের অভিযোগ, কোম্পানিতে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে এবং চাকরি টিকিয়ে রাখার অজুহাতে তাঁদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হতো।
শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের দাবি, তাঁদের দিয়ে দিনে ১২ ঘণ্টা, কখনও ১৬ ঘণ্টা, এমনকি ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হতো। অথচ অতিরিক্ত কাজের উপযুক্ত পারিশ্রমিক মিলত না। ওভারটাইমের টাকা কোথায় যেত, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, বাড়তি সময়ের কাজের অর্থের একটি বড় অংশ চলে যেত স্থানীয় রাজনৈতিক কার্যালয়ে। এই পুরো প্রক্রিয়া পরিচালিত হতো জাহাঙ্গীর খানের প্রভাববলয়ের মাধ্যমে এবং সেই টাকা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন সুরজিৎ প্রামাণিক।
এই বিষয়ে বুবাই হালদার নামে এক শ্রমিক জানান, “দীর্ঘদিন ধরে আমাদের কাছ থেকে কাটমানি নেওয়া হয়েছে। সুরজিৎ প্রামাণিক নামে ওই ব্যক্তি নিয়মিত টাকা নিত। জাহাঙ্গীর খানের নেতৃত্বেই সবকিছু চলত। কেউ প্রতিবাদ করলে মারধর পর্যন্ত করা হতো। আমরা গরিব মানুষ, চাকরি চলে যাওয়ার ভয় ছিল।
স্থানীয় বিজেপি নেতা দেবব্রত প্রামাণিক দাবি করেছেন, “এত বছর ধরে জাহাঙ্গীর খানের নেতৃত্বে এখানে তোলাবাজি চলেছে। শ্রমিকদের কষ্টের টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। আমরা শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে চাই।
এক টাকাও আর কাউকে কাটমানি দিতে হবে না। শ্রমিকরা নিজেদের উপার্জিত টাকা নিজেরাই বাড়িতে নিয়ে যাবেন।” আন্দোলনরত আরেক শ্রমিক বিশ্বজিৎ হাতি অভিযোগ করে বলেন, “শ্রম দিবসের দিনও আমাদের কাজ করতে হতো। কোনও ছুটি ছিল না।
যদি কেউ ছুটি চাইত, তাহলে কাজ থেকে বাদ দেওয়ার ভয় দেখানো হতো। জাহাঙ্গীর খান ঘনিষ্ঠ সুরজিৎ প্রামাণিকের নির্দেশেই এসব চলত। শুধু তাই নয়, তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সভা-মিছিলে যেতে বাধ্য করা হতো। কেউ না গেলে চাকরি কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হত।”
এই বিক্ষোভ ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে এলাকায়। যদিও অভিযুক্ত সুরজিৎ প্রামাণিক বা তৃণমূল নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই অভিযোগের বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি স্বাধীনভাবে। তবে শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে ইতিমধ্যেই ফলতা শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এখন দেখার, শ্রমিকদের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসন বা শ্রম দফতর কোনও তদন্তে নামে কিনা, এবং বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভের সুরাহা আদৌ হয় কি না।
আপাতত ন্যায্য মজুরি, কাটমানি বন্ধ এবং শ্রমিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতেই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিক্ষোভরত শ্রমিকরা।

