ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সামনে মমতা

নিউজ ডেস্ক :: সংবাদ প্রবাহ :: কোলকাতা :: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে সম্ভবত সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং জয়টি তিনি অর্জন করেছেন এই বছরে। ২০২১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যে পরিমাণ অর্থ খরচ করেছিল, তা পশ্চিমবঙ্গের তো বটেই, ভারতের যেকোনো রাজ্যের ইতিহাসে সম্ভবত রেকর্ড। প্রশাসনিক চাপ, রাজনৈতিক আক্রমণ এবং প্রধানমন্ত্রীর লাগাতার প্রচারের মধ্যেই জেতেন মমতা। বলা শুরু হয়, প্রধানমন্ত্রীকে হারিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

এই পর্যবেক্ষণের কোনো আনুষ্ঠানিক তাৎপর্য না থাকলেও রাতারাতি মমতা ভারতের রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন। তাঁর যে বছরটা খুব ভালো কেটেছে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কেমন কাটবে ২০২২?

প্রথমেই চোখ বোলানো যাক ভারতের নির্বাচনী মানচিত্রের ওপরে। ২০২২ সালের শুরু থেকে ’২৪ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে নির্বাচন হবে ২১টিতে। এর মধ্যে অন্তত তিন রাজ্য—উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা ও মেঘালয় এবং পশ্চিম ভারতের গোয়ায় তৃণমূল কংগ্রেস লড়বে। হয়তো তারা প্রার্থী দেবে আরও কিছু ছোট রাজ্য যেমন উত্তর ভারতের হরিয়ানায়।

এ ছাড়া বছরের শেষের দিকে রয়েছে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচন। যদি ধরে নেওয়া হয়, রাহুল গান্ধী পুরো সময়ের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেবেন, তবে সমীকরণ নতুন করে কষে দেখতে হবে। রাহুল গান্ধীর সঙ্গে এই মুহূর্তে মমতার সম্পর্ক চূড়ান্ত শীতল। অথচ তাঁদের দুজনকেই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিজেপিবিরোধী জোটে প্রয়োজন। রাহুল সভাপতি হওয়ার পর মমতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোন দিকে গড়াবে, তার কিছু ইঙ্গিত হয়তো পাওয়া যাবে আগামী বছর।

বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পর থেকে কংগ্রেসকে ভাঙছেন মমতা। আসামের বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও গোয়া—এই চার রাজ্যে নেতা-কর্মীদের টেনে নিয়ে কংগ্রেসের কোমর ভেঙে দিয়েছে তৃণমূল। এটা তিনি কেন করছেন, তার ব্যাখ্যা নিজেই দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। মাস কয়েক আগে দলের মুখপত্র ‘জাগো বাংলা’য় মমতা লেখেন: ‘সাম্প্রতিক অতীতে কংগ্রেস বিজেপিকে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে।

গত দুটি লোকসভা নির্বাচন তার বড় প্রমাণ। দিল্লিতে যদি লড়াই না থাকে, তাহলে মানুষের মনোবল কমে যায় এবং লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যগুলোতে বিজেপি কিছু বাড়তি ভোট পেয়ে যায়।

সেটা এবার কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না। বিকল্প জোটের নেতৃত্ব নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। কিন্তু বাস্তবটা কংগ্রেসকে অনুভব করতে হবে। অন্যথায় বিকল্প শক্তির গঠনে ফাঁক থেকে যাবে।’ মমতা আরও বলেছেন, সময়ের যাত্রাপথে এখন বিজেপির বিরুদ্ধে আসল লড়াইয়ের মুখ হয়ে উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেসই।

বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পর থেকে কংগ্রেসকে ভাঙছেন মমতা। আসামের বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও গোয়া—এই চার রাজ্যে নেতা-কর্মীদের টেনে নিয়ে কংগ্রেসের কোমর ভেঙে দিয়েছে তৃণমূল। এটা তিনি কেন করছেন, তার ব্যাখ্যা নিজেই দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। মাস কয়েক আগে দলের মুখপত্র ‘জাগো বাংলা’য় মমতা লেখেন: ‘সাম্প্রতিক অতীতে কংগ্রেস বিজেপিকে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে। গত দুটি লোকসভা নির্বাচন তার বড় প্রমাণ।

দিল্লিতে যদি লড়াই না থাকে, তাহলে মানুষের মনোবল কমে যায় এবং লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যগুলোতে বিজেপি কিছু বাড়তি ভোট পেয়ে যায়। সেটা এবার কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না। বিকল্প জোটের নেতৃত্ব নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। কিন্তু বাস্তবটা কংগ্রেসকে অনুভব করতে হবে। অন্যথায় বিকল্প শক্তির গঠনে ফাঁক থেকে যাবে।’ মমতা আরও বলেছেন, সময়ের যাত্রাপথে এখন বিজেপির বিরুদ্ধে আসল লড়াইয়ের মুখ হয়ে উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেসই।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্টদের হারানোর পর সারা বিশ্বে বিরাট প্রচার পান তৃণমূল নেত্রী। কিন্তু জাতীয় স্তরে ধাক্কা খান। প্রথমবার ২০১২ সালে উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী পার্টির প্রধান মুলায়ম সিং যাদবের সঙ্গে মিলে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বিরোধিতা করেন। এরপর মুলায়ম সিং রাতারাতি মত পাল্টে ফেলায়, প্রণব মুখোপাধ্যায়কে সমর্থন করতে বাধ্য হন মমতা। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পরে কেন্দ্রে এটা তাঁর প্রথম পিছু হটা।

দ্বিতীয়বার, ২০১৪ সালে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী সমাজকর্মী আন্না হাজারের সমর্থনে নিজেকে জাতীয় মঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন মমতা। তৃতীয়বার ফেডারেল ফ্রন্ট গড়ার লক্ষ্যে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রায় দুই ডজন রাজ্য ও জাতীয় স্তরের নেতাকে কলকাতায় এনে জনসভা করেন মমতা। তবে সেই ফ্রন্ট দাঁড়ায়নি। বরং ’১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের আসন ৩৪ থেকে কমে ২২ হয়ে যায়। বিজেপির আসন ২ থেকে বেড়ে হয় ১৮। সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন মমতা।

সেই বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে ২০২১-এ ঘুরে দাঁড়ালেন মমতা, তারপরই আবার অতীতের মতো জাতীয় স্তরে নিজেকে তুলে ধরতে উঠেপড়ে লাগলেন। তবে অতীতের সঙ্গে এবারের কয়েকটি তফাত আছে।

এক. অতীতে তিনি ছোট রাজ্যে প্রার্থী না দিয়ে সরাসরি দিল্লিতে গিয়ে ঝাঁপিয়ে ছিলেন। সেটা এবার তিনি করছেন না। দুই. অতীতে লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে মমতা জোট গঠনের কাজে নেমেছিলেন। এবার নেমেছেন সাড়ে তিন বছর আগে। তিন. সারা ভারতে একটি বার্তা মমতা দিতে পেরেছেন। নরেন্দ্র মোদিসহ গোটা বিজেপি নেতৃত্ব তাঁর বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচার করলেও তিনি তাঁদের হারাতে পারেন। এটা তিনি লিখেওছেন।

‘বাংলার এবারের নির্বাচনে গোটা দেশ দেখেছে বিজেপির সর্বশক্তিকে কীভাবে তৃণমূল হারিয়ে দিয়েছে। যাঁরা দেশ চালাচ্ছেন (আসলে ডোবাচ্ছেন), তাঁরা সবাই তো ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করলেন। কুৎসা করলেন। এজেন্সি (কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা) নামালেন। তবু তৃণমূলকে হারাতে পারলেন না। এটা একটা ইতিহাস। এটা একটা মডেল। দেশের মানুষ এই মডেলের ওপর ভরসা রাখছেন।

তাঁরা তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখছেন। তৃণমূল বিজেপি বিরোধী সবাইকে নিয়েই চলতে চায়। কিন্তু যে মডেলকে ঘিরে মানুষের উৎসাহ, সেই মডেলকে তো কার্যকরভাবে মানুষের সামনে পেশ করতে হবে। তৃণমূল দেশের মানুষের স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাবে না।’ অর্থাৎ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য ঝাঁপ দিতে তৃণমূল প্রস্তুত।

পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা
পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে প্রায় কোনো চ্যালেঞ্জই নেই, সেটা গত বিধানসভা এবং সদ্য সমাপ্ত কলকাতা পৌর করপোরেশনের নির্বাচনে বোঝা গেছে।

তবে অন্য চিন্তা রয়েছে মমতার। সবেমাত্র তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে দায়িত্ব ছাড়তে শুরু করেছেন তিনি। আগামী পাঁচ বছরে, অর্থাৎ ২০২৬ সালে বোঝা যাবে সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কি না। ’২৬-এ তৃণমূলের ক্ষমতায় থাকার ১৫ বছর পূর্ণ হবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, সামনে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের দুর্নীতি এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বাড়বে, যা ইতিমধ্যে স্পষ্ট। ফলে মানুষের ক্ষোভও স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। পশ্চিমবঙ্গের মতো জটিল রাজ্যে এই দুর্নীতি, দ্বন্দ্ব ও ক্ষোভ সামলে অভিষেক এগোতে পারবেন কি না, সেটা হয়তো কিছুটা বোঝা যাবে আগামী বছরেই।

দ্বিতীয়ত. মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী সাফল্যের বড় কারণ প্রায় ১০০ জনকল্যাণ প্রকল্প, যার আওতায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে কিছু না কিছু দেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্প তাঁকে দুটি নির্বাচনে জয় এনে দিলেও পাঁচ বছর পর এটা কাজ করবে কি না, সেটা একটা প্রশ্ন। এর কারণ, মানুষকে ভাতা দেওয়া হলেও চাকরি দেওয়া যাচ্ছে না। চাকরির সুযোগ বাড়াতে ও বিনিয়োগ আনার লক্ষ্যে সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি গৌতম আদানির সঙ্গে কলকাতায় বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এমনকি রাজনৈতিক বৈরিতা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে রাজ্যের বার্ষিক বাণিজ্য সম্মেলনে। মমতা হয়তো আশা করছেন, বিনিয়োগ টানতে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সাহায্য করবেন। এই লক্ষ্যে তিনি কতটা সফল হলেন, সেটাও বলবে ২০২২।

কর্মহীনতার সঙ্গে লড়তে মমতাও রাজ্যে নিয়ে আসছেন আদানি গোষ্ঠীকে। দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ আদিবাসী অঞ্চলে একটি বিশালাকায় খনি থেকে কয়লা তুলতে চাইছেন। আদিবাসীরা রুখে দাঁড়িয়েছেন, আর তাঁদের মদদ দিচ্ছে মূলস্রোতের বামপন্থী দলগুলো, যারা দেড় দশক আগে টাটা গোষ্ঠীকে রাজ্যে নিয়ে এসেছিল। কিছু নকশালবাদী দল এবং স্থানীয় বিজেপিও রয়েছে আদিবাসীদের পাশে, যেমনটা ছিল দেড় দশক আগে। অর্থাৎ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে মমতার চোখের সামনে।

এই অবস্থায় কী হবে মমতার রাজনৈতিক কর্মপন্থা, ভবিষ্যৎ? দিল্লিতে সম্ভাব্য জোটের নেতৃত্ব করায়ত্ত করার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে কর্মহীনতা এবং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়ে তিনি কি ভারতের রাজনীতিতে নিজের জায়গাটাকে আরও একটু শক্তপোক্ত করতে পারবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − ten =