৩৫০ বছরের ঐতিহ্য অটুট, সাড়ম্বরে পালিত হল বারুইপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির ঐতিহাসিক রথযাত্রা

সুদেষ্ণা মন্ডল :: সংবাদ প্রবাহ :: বারুইপুর :: বৃহস্পতিবার ১৬,জুলাই :: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে এ বছরও ভক্তি, আচার এবং উৎসবের আবহে পালিত হল রায়চৌধুরী বাড়ির ঐতিহাসিক রথযাত্রা।

রথযাত্রা উপলক্ষে সকাল থেকেই রায়চৌধুরী বাড়ি এবং সংলগ্ন রাস ময়দান ভরে ওঠে হাজার হাজার ভক্ত, দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীর সমাগমে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকেও বহু মানুষ এই ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা দেখতে বারুইপুরে আসেন।

ইতিহাস অনুযায়ী, জমিদার রাজবল্লভ রায়চৌধুরী স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর নিজের বাড়িতেই শ্রীজগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকেই শুরু হয় এই রথযাত্রার প্রচলন। দীর্ঘ প্রায় ৩৫০ বছর ধরে রায়চৌধুরী পরিবারের উদ্যোগে একই রীতি-নীতি ও ধর্মীয় আচার মেনে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে।

সময় বদলেছে, কিন্তু ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়েনি। রথযাত্রার দিন বিশেষ পূজা, মন্ত্রোচ্চারণ, আরতি ও ভোগ নিবেদনের পর সুসজ্জিত রথে আরোহন করানো হয় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে। এরপর ভক্তদের উপস্থিতিতে শুরু হয় রথ টানার অনুষ্ঠান।

রথের দড়িতে একবার হাত রাখার জন্যও ভক্তদের মধ্যে ছিল প্রবল উৎসাহ। অনেকের বিশ্বাস, নিষ্ঠার সঙ্গে রথ টানলে জীবনে শুভ ফল লাভ হয় এবং মনস্কামনা পূরণ হয়।এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে রায়চৌধুরীদের ঐতিহ্যবাহী রাস ময়দানে বসেছে বিশাল মেলা, যা প্রায় এক মাস ধরে চলবে।

মেলায় রয়েছে খেলনা, পোশাক, গৃহস্থালির সামগ্রী, হস্তশিল্প, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি ও খাবারের দোকান। বিশেষ করে গরম জিলিপি, ভাজা বাদাম এবং নানা ধরনের মুখরোচক খাবারের দোকানে ছিল উপচে পড়া ভিড়। শিশুদের জন্য নাগরদোলা ও বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থাও মেলার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

বারুইপুরের এই রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একসময় এই রায়চৌধুরী বাড়িতে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন।

তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী-এর একটি বড় অংশ এখানেই রচিত হয়েছিল বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। ফলে এই বাড়ির সঙ্গে ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি সাহিত্য-ইতিহাসেরও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

শতাব্দীপ্রাচীন এই রথযাত্রা আজও বারুইপুরের গর্ব। ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং লোকজ সংস্কৃতির অনন্য মেলবন্ধনে রায়চৌধুরী বাড়ির রথযাত্রা প্রতি বছরই নতুন প্রজন্মকে বাংলার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 + fourteen =