সুদেষ্ণা মন্ডল :: সংবাদ প্রবাহ :: কলকাতা ডেস্ক :: বৃহস্পতিবার ১৬,জুলাই :: ছোটবেলার সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলগুলোর কথা মনে পড়ে? যখন পাড়ার মোড়ে একটা ছোট কাঠের রথে জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রাকে বসিয়ে আমরা দড়ি ধরে টানতাম? মুখে থাকত জয় জগন্নাথ ধ্বনি।
কিন্তু আমরা কজন জানি, পুরীর সেই বিশাল রথগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে কত শত বছরের ইতিহাস, নিখুঁত বিজ্ঞান আর গভীর আধ্যাত্মিকতা? চলুন আজ নিয়ে যাই এক অদ্ভুত যাত্রায়, যেখানে ইতিহাস আর ভক্তি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।
রথ তৈরির অদ্ভুত কারিগরি
প্রতি বছর ওড়িশার পুরীতে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উৎসবকে কেন্দ্র করে যে তিনটি বিশাল রথ তৈরি হয়, তার পেছনে রয়েছে এক অলৌকিক নির্মাণশৈলী। এই রথ তৈরির কাজ শুরু হয় এক অত্যন্ত পবিত্র দিনে—অক্ষয় তৃতীয়া। মন্দির প্রাঙ্গণে তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় তুমুল ব্যস্ততা।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই বিশাল আকৃতির রথগুলো তৈরি করতে কিন্তু একটাও লোহার পেরেকের ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ রথটি তৈরি হয় সোজা এবং খাঁটি নিমকাঠ দিয়ে। বংশ পরম্পরায় কিছু নির্দিষ্ট কারিগর এই কাজ করে আসছেন। এদের মধ্যে বিশ্বকর্মা সেবকরা রথের মূল কাঠামোটি তৈরি করেন।
চাকা ঠিক করার সমস্ত দায়িত্ব থাকে পাহী মহারানার ওপর। আর লোহার উপাদান বা আনুষঙ্গিক জিনিস তৈরির দায়িত্ব যে দলের ওপর থাকে, তারা হলেন ওঝা মহারানা। কোনো আধুনিক নকশা বা ম্যাপ ছাড়াই, কেবল পূর্বপুরুষদের শেখানো বিদ্যায় বছরের পর বছর ধরে নিখুঁতভাবে এই রথগুলো গড়ে তোলা হয়।
নন্দীঘোষ: জগতের নাথের মহাবাহন
সবার প্রথমে বলা যাক স্বয়ং জগন্নাথ দেবের রথের কথা। তাঁর এই প্রধান রথটির নাম নন্দীঘোষ। এ ছাড়াও এটি গরুড়ধ্বজ বা কপিধ্বজ নামেও সমান পরিচিত। দূর থেকে দেখলেই চেনা যায় এই রথটিকে, কারণ এটি ঢাকা থাকে উজ্জ্বল লাল ও হলুদ কাপড়ে।
নন্দীঘোষের মোট উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। এই বিশাল রথটি দাঁড়িয়ে থাকে ১৬টি চাকার ওপর, যা তৈরি করতে প্রয়োজন হয় ৮৩২টি কাঠের টুকরো। রথের চূড়ায় যে পতাকা থাকে, তার নাম ত্রৈলোক্যমোহিনী। এই রথের রক্ষক হলেন স্বয়ং গরুড় বা নৃসিংহ এবং এর সারথির নাম দারুক। এই রথের প্রধান অস্ত্র হলো শঙ্খ ও চক্র।
শঙ্খ, বলাহক, শ্বেত এবং হরিদস্য নামের চারটি সাদা রঙের ঘোড়া এই রথটিকে টেনে নিয়ে চলে। আর সাধারণ মানুষ রথ টানার জন্য যে রশিতে টান দেয়, সেই পবিত্র দড়িটির নাম শঙ্খচূড়া।
তালধ্বজ: বড় দাদার বীরত্বের প্রতীক
এবার আসা যাক জগন্নাথ দেবের বড় দাদা বলরামের রথের কথায়। তাঁর রথটি লাল ও সবুজ (নীলাভ-সবুজ) কাপড়ে মোড়া থাকে এবং এটি তালধ্বজ নামে পরিচিত। এর অপর নাম লাঙ্গলধ্বজ।
বলরামের রথের মোট উচ্চতা ৪৪ ফুট। এই রথটিতে থাকে ১৪টি চাকা এবং এর নির্মাণে ৭৬৩টি কাঠের টুকরো প্রয়োজন হয়। বাসুদেব এই রথের রক্ষা করেন । এ ছাড়াও এর দ্বারপাল হলেন নন্দ ও সুনন্দ আর সারথির নাম মাতালি। রথের চূড়ায় অবস্থিত পতাকার নাম উনানি। এই রথের প্রধান অস্ত্র হলো মুষল ও হল।
বলরামের তালধ্বজ রথে কালো রঙের চারটি ঘোড়া জোড়া থাকে, যাদের নাম তীব্র, ঘোড়া, দীর্ঘশর্মা ও স্বর্ণনাভ। আর এই রথের রশি হিসেবে ব্যবহার করা হয় বাসুকী নাগ।
দর্পদলন: বোন সুভদ্রার আদরের রথ
সবশেষে যার কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন দুই ভাইয়ের প্রিয় বোন সুভদ্রা। সুভদ্রার রথটির নাম দর্পদলন। তবে অনেকে একে দেবদলন বা পদ্মধ্বজ নামেও চেনেন। এই রথটি সাজানো হয় লাল ও কালো কাপড়ে।
তিনটি রথের মধ্যে এটি আকারে সবচেয়ে ছোট, যার উচ্চতা ৪৩ ফুট। দর্পদলন রথটিতে ১২টি চাকা রয়েছে এবং এটি ৫৯৩টি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। জয়দুর্গা এই রথের রক্ষা করে থাকেন। এই রথের দ্বারপাল হলেন গঙ্গা ও যমুনা এবং সারথি হিসেবে স্বয়ং অর্জুন এই রথ চালান। রথের চূড়ায় থাকা পতাকার নাম নাদম্বিকা।
সুভদ্রার রথের প্রধান অস্ত্র হলো ভুবনেশ্বরী ও চন্দা। এই রথটি টেনে নিয়ে চলে রোচিকা, মোচিকা, জিতা ও অপরাজিত নামের চারটি লাল রঙের ঘোড়া। আর এই রথের দড়ির নাম হলো স্বর্ণচূড়া।
এই তিন রথের মহাযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি হলো মানুষের জীবনের এক গভীর দর্শন। চাকার ঘূর্ণন যেমন আমাদের জীবনের পরিবর্তনশীল সময়কে মনে করিয়ে দেয়, তেমনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যখন এক হয়ে রথের দড়িতে টান দেয়, তখন ঘুচে যায় সমস্ত ভেদাভেদ।

