আনন্দ মুখোপাধ্যায় :: সংবাদ প্রবাহ :: স্পোর্টস ডেস্ক :: বুধবার ১৫,জুলাই :: বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা—এ কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি ইতিহাস, আবেগ, প্রতিশোধ, রাজনীতি এবং কিংবদন্তির এক বিস্ময়কর মিশ্রণ। মাঠে দুই দলের ২২ জন ফুটবলার নামলেও গ্যালারিতে যেন মুখোমুখি দাঁড়ায় দুই দেশের অতীত।
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্কে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে মাত্র ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে শত শত সৈন্য প্রাণ হারান।
যুদ্ধের চার বছর পর, ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে যখন ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়, তখন সেটি শুধু ফুটবল ছিল না—ছিল জাতীয় গৌরবের লড়াই।
সেই ম্যাচেই জন্ম নেয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি গোল। প্রথমটি ছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার হাত দিয়ে করা গোল, যা পরে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন—“A little with the head of Maradona and a little with the hand of God।”
অর্থাৎ, “ম্যারাডোনার মাথা আর ঈশ্বরের হাতের সামান্য সাহায্যে।” সেই থেকেই ‘Hand of God’ ফুটবল অভিধানের অংশ হয়ে যায়।
মাত্র কয়েক মিনিট পরই ম্যারাডোনা মাঝমাঠ থেকে একক দৌড়ে পাঁচজন ইংরেজ ফুটবলারকে কাটিয়ে যে গোলটি করেছিলেন, সেটিকে আজও অনেকেই ‘Goal of the Century’ বলে মনে করেন। এক ম্যাচে বিতর্ক ও বিস্ময়ের এমন যুগলবন্দি বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিরল।
এরপরও দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহুবার বিশ্বমঞ্চে ফিরে এসেছে। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড, ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের জয়—প্রতিটি অধ্যায়ই নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে এই দ্বৈরথে।
এবারের বিশ্বকাপে আবার যখন ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি, তখন প্রশ্ন উঠছেই—ইতিহাস কি আবার নতুন নাটক লিখবে?
আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা আশা করবেন ম্যারাডোনার উত্তরাধিকার বহন করে দল আবারও জয়ের ইতিহাস রচনা করবে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড চাইবে বহু বছরের আক্ষেপ মুছে প্রতিশোধের হাসি হাসতে।
তবে আধুনিক ফুটবল অনেকটাই বদলে গেছে। এখন রয়েছে VAR, গোললাইন প্রযুক্তি এবং আরও উন্নত রেফারিং ব্যবস্থা।
ফলে ১৯৮৬ সালের মতো ‘ভগবানের হাত’ দিয়ে গোল করার সুযোগ কার্যত নেই। কিন্তু ফুটবলের অপ্রত্যাশিত নাটকীয়তা আজও অমলিন। তাই নতুন কোনো কিংবদন্তি জন্ম নিতেই পারে। শেষ পর্যন্ত এই লড়াই শুধু একটি সেমিফাইনাল নয়;
এটি দুই ফুটবল সংস্কৃতির সংঘর্ষ, ইতিহাসের প্রতিধ্বনি এবং কোটি কোটি সমর্থকের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি হয়তো আজ আর সরাসরি মাঠে নেই, কিন্তু সেই অতীতের ছায়া এখনও এই দ্বৈরথকে অন্য সব ম্যাচের চেয়ে আলাদা মর্যাদা দেয়।
হয়তো এবার ‘ভগবানের হাত’ নয়, জয় নির্ধারণ করবে ফুটবলীয় দক্ষতা, কৌশল এবং মানসিক দৃঢ়তা। তবু একটি বিষয় নিশ্চিত—ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা মানেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় লেখার অপেক্ষা।

