নেপালের হড়কা বান – চীন তথ্য দেয়নি ?

সজল দাশগুপ্ত :: সংবাদ প্রবাহ :: বিদেশ ডেস্ক :: মঙ্গলবার ০১,সেপ্টেম্বর :: ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর কেটে গিয়েছে পাঁচ দিন। আর এই বিপর্যয়ের মধ্যেই সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—প্রায় তিন মাস আগেই তিব্বতের হিমবাহ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ডাটা চেয়ে চিনের দ্বারস্থ হয়েছিল নেপালের হাইড্রোলজি বিভাগ।

গত ২৭ মে কাঠমান্ডুতে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে হিমবাহের গতিবিধি, জলস্তর বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার আগাম তথ্য চাওয়া হয়েছিল বেজিংয়ের কাছে। কিন্তু সেই অতি-জরুরি তথ্য আদৌ কতটা পাওয়া গিয়েছিল, তা নিয়েই এখন তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।

এরই মধ্যে নেপালের পাহাড় ও নদীর ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসছে একের পর এক মৃতদেহ। শেষ পাওয়া সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০৩-এ। নিখোঁজের সংখ্যা এখনও ৪২০০-র বেশি।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই যে, দ্রুত পচতে থাকা শত শত অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ শনাক্ত করাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বাধ্য হয়ে চিতওয়ানের দেবঘাট জঙ্গলে গণকবরের ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন। শেষ দু’দিনে ১৯৬টি দেহ গণকবর দেওয়া হয়েছে।

প্রতিটি মৃতদেহের সঙ্গে রাখা হচ্ছে পৃথক শনাক্তকরণ নম্বর ও প্রয়োজনীয় নথি, যাতে ভবিষ্যতে DNA পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়। তিন মাস আগে ঠিক কী চেয়েছিল নেপাল?

রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিপর্যয়ের ঠিক তিন মাস আগে ২৭ মে কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে চিনের কাছে তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমবাহ অঞ্চল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ও আগাম তথ্য চেয়েছিল নেপালের হাইড্রোলজি বিভাগ।

নেপালের বিশেষজ্ঞ সৌহার্দ্র জোশী ও বিনোদ পরাজুলি-র অভিযোগ, তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় চিন মূলত ভারী বৃষ্টির তথ্য পাঠাত। কিন্তু নেপালের প্রয়োজন ছিল আরও নির্দিষ্ট ও দ্রুত আপডেট—তুষারধস, জলস্তরের বৃদ্ধি এবং পার্মাফ্রস্টের পরিবর্তন সংক্রান্ত তথ্য।

এমনকী এই ধরনের অতি-জরুরি তথ্য প্রতি ১০ মিনিট অন্তর দেওয়ার আবেদনও জানানো হয়েছিল বলে দাবি নেপালের বিশেষজ্ঞদের।

কিন্তু অভিযোগ, সেই তথ্য শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত মাত্রায় পাওয়া যায়নি। আর এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—সময়মতো এই তথ্য হাতে এলে কি নেপাল আগাম সতর্কবার্তা জারি করতে পারত?

নেপালের বিশেষজ্ঞদের দাবি, চিনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ার কারণেই বিপর্যয়ের আগে যথাযথ সতর্কবার্তা জারি করা সম্ভব হয়নি। চিনের পাল্টা দাবি, অভিযোগ ভিত্তিহীন যদিও নেপালের এই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করেছে চিন।

কাঠমান্ডুর চিনা দূতাবাসের দাবি, নেপালের অভিযোগ ভিত্তিহীন। সীমান্তের ওপারে আবহাওয়া সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় ছিল বলেই দাবি করেছে বেজিং।
চিনা দূতাবাস আরও জানিয়েছে, দুর্গম হিমালয় সীমান্তে রিয়েল-টাইম ডাটা ট্র্যাকিং অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ।

ভৌগোলিক দুর্গমতা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে প্রতিটি মুহূর্তের তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করা সহজ নয়।
তবে চিনের দাবি, নেপালের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয়েছিল।

একদিকে নেপালের দাবি—তিন মাস আগেই চিনের কাছে চাওয়া হয়েছিল তিব্বতের হিমবাহের গুরুত্বপূর্ণ ডাটা। চাওয়া হয়েছিল জলস্তর, তুষারধস ও পার্মাফ্রস্টের পরিবর্তনের মতো অতি-জরুরি তথ্য। অন্যদিকে চিনের বক্তব্য—প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়েছিল এবং দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগও বজায় ছিল।

তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—চাওয়া তথ্য যদি সময়মতো এবং প্রয়োজনীয় মাত্রায় পাওয়া যেত, তাহলে কি নেপালকে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো? নাকি হিমালয়ের দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও আকস্মিক প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কাছে আগাম সতর্কতাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যেত?

তিন মাস আগে চাওয়া সেই ডাটাই এখন নেপালের এই মহাবিপর্যয় ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven − seven =