পাখি পাচারের অভিযোগে বারুইপুরে আরণ্যক উদ্যানের সুপারভাইজার পল্লব ভারতী গ্রেপ্তার

সুদেষ্ণা মন্ডল  :: সংবাদ প্রবাহ :: বারুইপুর  :: শুক্রবার ৩১,জুলাই :: আরণ্যক বনভোজন উদ্যানে ১৩টি ময়ূর-সহ একাধিক দেশি-বিদেশি পাখির হদিশ না মেলা এবং বেশ কয়েকটি পাখির মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বারুইপুরে।

পাখি পাচারের অভিযোগে আরণ্যক বনভোজন উদ্যানের সুপারভাইজার পল্লব ভারতীকে গ্রেফতার করেছে বারুইপুর থানার পুলিশ।

বুধবার দুপুরে তাঁকে প্রথমে আটক করা হয়। পরে রাতে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। একইসঙ্গে বন দফতরের পক্ষ থেকেও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

অভিযোগ, আরণ্যক বনভোজন উদ্যানে রাখা বেশ কিছু দেশি-বিদেশি পাখির হিসাব মিলছে না। বিশেষ করে ১৩টি ময়ূর-সহ একাধিক পাখির কোনও হদিশ নেই বলে অভিযোগ। শুধু পাখি নিখোঁজ নয়, বেশ কয়েকটি ময়ূর মারা যাওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই একাধিক প্রশ্ন উঠছে।

এ প্রসঙ্গে আরণ্যক বনভোজন উদ্যানের কর্মী গোপাল সর্দার বলেন, “দশটা ময়ূর মারা গেছে। খাবার দিয়ে চলে গিয়েছিলাম। সকালে এসে দেখি মরে পড়ে আছে। একদিন চারটে, একদিন দুটো ময়ূর মরে গেছে।” তাঁর এই বক্তব্যে ময়ূরের মৃত্যুর সংখ্যা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, বারুইপুর পশ্চিম ১ নম্বর বিজেপি মণ্ডল সভাপতি গৌতম চক্রবর্তী অভিযোগ করেন, “তৃণমূল পশু চোর। একটা বেআইনি পশু চক্র কাজ করছে। কাউন্সিলররা চালাত এটা। এখানে ১৩টা ময়ূর ছিল।

রাতারাতি গায়েব হয়ে গেল। পুরসভা বলছে, বাজ পড়ে মারা গেছে।” যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্ত সাপেক্ষ। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও সামনে আসা প্রয়োজন।

ময়ূরের মৃত্যুকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। ভারতের জাতীয় পাখি ময়ূর মারা যাওয়ার পর বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ সংক্রান্ত নিয়ম মেনে বন দফতরকে খবর দেওয়া হয়েছিল কি না, মৃত পাখিগুলির ময়নাতদন্ত করা হয়েছিল কি না, কিংবা সরকারি বিধি মেনে দেহাবশেষ নিষ্পত্তি করা হয়েছিল কি না—তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, নিয়ম মেনে ব্যবস্থা না নিয়ে যদি কোনও মৃত ময়ূরকে গোপনে পুঁতে ফেলা হয়ে থাকে, তাহলে তার পিছনে অন্য কোনও ঘটনা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

এই পরিস্থিতিতেই বুধবার গভীর রাতে পল্লব ভারতীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর বৈষ্ণব পাড়ার বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালায় বারুইপুর থানার পুলিশ। তল্লাশিকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। বাড়ির সামনে ভিড় জমান স্থানীয় বাসিন্দারা। নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন করা হয় প্রচুর পুলিশ বাহিনী। জানা গিয়েছে, তল্লাশির সময় পল্লব ভারতীর স্ত্রী ও ছেলেকেও বাড়িতে আনা হয়েছিল।

পুলিশ সূত্রে খবর, বারুইপুর পুরসভার সাফাই বিভাগের সুপারভাইজার পল্লব ভারতীর তিনতলা প্রাসাদোপম বাড়ির প্রায় প্রতিটি ঘরেই তল্লাশি চালানো হয়। বাড়ির বাইরে থেকে বেশ কিছু ময়ূরের পালক উদ্ধার হয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি।

এছাড়াও আফ্রিকান টিয়া ও কাকাতুয়া জাতীয় বিদেশি পাখির হদিশ মিলেছে বলে জানা গিয়েছে। বাড়ির ভিতরে একটি বাক্স থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং কয়েকটি চেকবই উদ্ধার করা হয়। তদন্তের স্বার্থে সেগুলি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া নথিপত্র ও চেকবইয়ের সঙ্গে আরণ্যক বনভোজন উদ্যানের আর্থিক লেনদেন বা পাখি সংক্রান্ত কোনও কারবারের যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
শুধু বৈষ্ণব পাড়ার বাড়িতেই নয়, পল্লব ভারতীর সঙ্গে যুক্ত আরও একটি জায়গাতেও তল্লাশি চালানো হয়।

আদিগঙ্গার পাশে আরণ্যক বনভোজন উদ্যান লাগোয়া তাঁর ‘চায়ে কাফে’ নামের রেস্তোরাতেও অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে একাধিক রেজিস্টার ও খাতা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ওই রেজিস্টারগুলিতে কারা আসতেন, তাঁদের সঙ্গে কোনও আর্থিক লেনদেনের তথ্য রয়েছে কি না, কিংবা পাখি কেনাবেচা বা পাচার সংক্রান্ত কোনও তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

এরপর পল্লব ভারতীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকুরিয়ার একটি ফ্ল্যাটেও তল্লাশি চালায় পুলিশ। অর্থাৎ বুধবার রাতেই একাধিক জায়গায় অভিযান চালিয়ে নথি, রেজিস্টার ও পাখি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন তদন্তকারীরা।

এখন তদন্তকারীদের মূল নজর আরণ্যক বনভোজন উদ্যানে থাকা পাখিদের প্রকৃত সংখ্যা, তাদের রক্ষণাবেক্ষণের নথি এবং নিখোঁজ পাখিদের গতিপথের দিকে। ১৩টি ময়ূর-সহ যে পাখিগুলির হদিশ মিলছে না, সেগুলি কোথায় গেল, কোনও পাখি বিক্রি করা হয়েছিল কি না, অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল কি না অথবা এর পিছনে কোনও পাচারচক্র সক্রিয় ছিল কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে।

এই বিষয়ে বারুইপুর পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অতীশ বিশ্বাস বলেন, “অভিযোগের ভিত্তিতে তিনজনকে আটক করা হয়েছিল। তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তল্লাশি অভিযান চালানোর পর ইতিমধ্যেই একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওয়াইল্ডলাইফ অ্যাক্টে মামলা রুজু করা হয়েছে।”

সব মিলিয়ে আরণ্যক বনভোজন উদ্যানের পাখি নিখোঁজ, ময়ূরের মৃত্যু এবং কথিত পাখি পাচারের অভিযোগকে ঘিরে তদন্ত আরও জোরদার হয়েছে। উদ্ধার হওয়া নথি, রেজিস্টার এবং পাখি-সংক্রান্ত সামগ্রীর সূত্র ধরে তদন্ত কতদূর এগোয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine − four =