পোকায় ধরা মশলায় রান্না, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিলি! বাঁকুড়ার ইন্দপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে ক্ষোভে ফুঁসলেন বিধায়ক

নিজস্ব সংবাদদাতা :: সংবাদ প্রবাহ :: বাঁকুড়া :: মঙ্গলবার ১৫,সেপ্টেম্বর :: মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া মশলায় কিলবিল করছে পোকা, আর তা দিয়েই তৈরি হচ্ছে রোগীদের পথ্য। অন্যদিকে গোডাউনে মজুত রাশি রাশি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। এমনকি সংক্রামক ব্যাধি আর সাধারণ জ্বর-জ্বালা— সব রোগীকেই গুঁজে রাখা হয়েছে একই ওয়ার্ডে ।

বাঁকুড়ার ইন্দপুর ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আচমকা পরিদর্শনে গিয়ে এমনই হাড়হিম করা অব্যবস্থা ও দুর্নীতির অভিযোগে সরব হলেন ছাতনার বিজেপি বিধায়ক সত্যনারায়ণ মুখোপাধ্যায়।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক (বিএমওএইচ)-এর বিরুদ্ধে ভুয়ো বিল বানিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে সরাসরি তাঁর সাসপেনশনের দাবিতে সুর চড়িয়েছেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রের খবর, ইন্দপুর ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সার্বিক পরিষেবা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই ক্ষোভ জমছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে।

রোগী কল্যাণ সমিতির সভাপতি তথা স্থানীয় বিধায়ক সত্যনারায়ণবাবু এদিন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঝটিকা পরিদর্শনে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি যা দেখলেন, তাতে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার জোগাড়।

সরাসরি হাসপাতালের রান্নাঘরে ঢুকে বিধায়ক দেখেন, সেখানে রোগীদের জন্য রান্না করা খাবারে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। তিনি অভিযোগ করেন, রান্নার জন্য যে মশলা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলির শুধু মেয়াদই ফুরিয়ে যায়নি, মশলার প্যাকেটে পোকাও ধরে গেছে।

রান্নাঘরের পর অন্তর্বিভাগে ঢুকতেই ধরা পড়ে আরও এক বিপজ্জনক চিত্র। বিধায়কের দাবি, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ম্যালেরিয়া ও ডায়রিয়ার মতো সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের সাধারণ জ্বর-জ্বালার রোগীদের সঙ্গেই পাশাপাশি বেডে রাখা হয়েছে। এতে অন্য রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর প্রবল ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এখানেই শেষ নয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্রের কাজকর্ম এবং হাসপাতালের ওষুধ গোডাউন পরিদর্শনে গিয়ে আর্থিক দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন বিধায়ক।

তাঁর দাবি, ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্রের গাড়িচালকদের দিনে ১২০ থেকে ২৪০ টাকা দেওয়া হলেও, হাসপাতালের বিল শাখায় কর্মীদের টিফিন বাবদ দৈনিক দেড় হাজার টাকার ভুয়ো বিল জমা পড়ছে।

বিধায়কের অভিযোগ, ‘গোড়াই সেন্টার’ নামের যে সংস্থার নামে এই খাবারের বিল তৈরি হচ্ছে, বাস্তবে তাদের কোনও খাবারের দোকানই নেই। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মী ও চালকদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে বিএমওএইচ নিজে নির্দেশ দিয়ে এই কাটমানির টাকা তুলছেন।

ওষুধের গোডাউন প্রসঙ্গে সত্যনারায়ণবাবু বলেন, “বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সেখানে মজুত রয়েছে। কিছু আলাদা রাখা হলেও, বাকি বহু মেয়াদ ফুরোনো ওষুধ রোগীদের এখনও নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে। এই ওষুধ খেলে রোগীদের প্রাণহানি পর্যন্ত ঘটতে পারে!”

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডেকে পাঠানো হয় ইন্দপুরের বিডিও প্রসেনজিৎ চৌধুরী -কেও। তিনিও এসে এই অনিয়মের প্রমাণ পান বলে বিধায়ক জানান। ঘটনার প্রেক্ষিতে জেলাশাসক ও জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিককে (সিএমওএইচ) বিস্তারিত জানিয়েছেন বিধায়ক।

তাঁর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, “সিএমওএইচ হাত গুটিয়ে বসে রয়েছেন। অবিলম্বে এই বিএমওএইচ-কে সাসপেন্ড করতে হবে। জেলা প্রশাসন দ্রুত কড়া পদক্ষেপ না করলে আমি সরাসরি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হব।”

তবে সরকারি হাসপাতালে এমন চূড়ান্ত গাফিলতি ও তছরুপের অভিযোগে ইতিমধ্যেই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে জেলা স্বাস্থ্য মহলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − 5 =