আনন্দ মুখোপাধ্যায় :: সংবাদ প্রবাহ :: নয়াদিল্লি ডেস্ক :: মঙ্গলবার ৯,জুন :: ভারতের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা নীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল সুইডেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা Stockholm International Peace Research Institute (SIPRI) (SIPRI)।
সংস্থার সদ্য প্রকাশিত SIPRI Yearbook 2026-এ দাবি করা হয়েছে, ভারত প্রথমবারের মতো অন্তত ১২টি পারমাণবিক ওয়ারহেড সক্রিয়ভাবে মোতায়েন (deployed) করেছে। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
SIPRI-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতের মোট পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের পরিমাণ প্রায় ১৯০টি ওয়ারহেড। এর মধ্যে ১২টি ওয়ারহেড এমন অবস্থায় রাখা হয়েছে, যা প্রয়োজন হলে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য।
অতীতে ভারত সাধারণত পারমাণবিক ওয়ারহেড এবং ক্ষেপণাস্ত্রকে আলাদা করে সংরক্ষণ করত। নতুন রিপোর্ট সেই অবস্থান থেকে সরে আসার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে একাধিক কৌশলগত কারণ থাকতে পারে।
প্রথমত, চীনের দ্রুত পারমাণবিক শক্তি বৃদ্ধি। SIPRI জানিয়েছে, চীনের হাতে বর্তমানে প্রায় ৬২০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে এবং তারা ধারাবাহিকভাবে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ও সাইলো নির্মাণ করছে।
দ্বিতীয়ত, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সাম্প্রতিক উত্তেজনা। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘাত আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। SIPRI বলছে, ভারতের আধুনিকীকরণ কর্মসূচি একদিকে চীনকে লক্ষ্য করলেও পাকিস্তানও এখনও কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তৃতীয়ত, ভারতের সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করা। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে ভারতের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিনগুলো নিয়মিত প্রতিরোধমূলক টহল শুরু করেছে |
যার ফলে কিছু ওয়ারহেড সাবমেরিনে স্থায়ীভাবে মোতায়েন থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাসের যুগ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে বলে সতর্ক করেছে SIPRI। সংস্থার মতে, বর্তমানে বিশ্বের ৯টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশই অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী— বিশ্বে মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা প্রায় ১২,১৮৭টি।
এর মধ্যে প্রায় ৯,৭৪৫টি সামরিক ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত।
প্রায় ৪,০১২টি ইতিমধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান বাহিনীর সঙ্গে মোতায়েন রয়েছে।
SIPRI-এর পরিচালক করিম হ্যাগগ সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে, যা ভুল সিদ্ধান্ত বা সংঘাত বৃদ্ধির ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
ভারত সরকার এখনও SIPRI-এর এই মূল্যায়ন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি। ভারত ঐতিহ্যগতভাবে তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে সীমিত তথ্য প্রকাশ করে এবং “No First Use” নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার কথা বলে এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, ১২টি ওয়ারহেড মোতায়েনের খবর সত্য হলে তা ভারতের প্রতিরক্ষা কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনের ইঙ্গিত।
SIPRI-এর ২০২৬ সালের রিপোর্ট শুধু ভারতের নয়, গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
চীন, পাকিস্তান ও অন্যান্য পারমাণবিক শক্তিধর দেশের প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারতের ১২টি ওয়ারহেড মোতায়েনের খবর দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে সরকারি নিশ্চিতকরণ ছাড়া এই তথ্যকে এখনও গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

